সর্বশেষ

ফেবু লিখন

স্মৃতিচারণ

দেখি ফিরে,বার বার

ড. মুনিরুছ সালেহীন
ড. মুনিরুছ সালেহীন

শুক্রবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৫ ৮:৪৫ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
পেছন ফিরে তাকালেই দেখি পেরিয়ে এসেছি বেশ দীর্ঘপথই। বয়স কেবলই একটি সংখ্যা- এ রকম ভাবায় আনন্দ আছে।

সেই আনন্দে সামনের দিনগুলোর চেয়ে পেছনে ফেলে আসা দিনগুলো অনেক বেশি আলোড়িত করে।

সেই কবে পড়েছিলাম শিল্পী রামকিংকর বেইজের জীবনভিত্তিক উপন্যাস, সমরেশ বসু'র 'দেখি নাই ফিরে।' আলোড়ন তোলা লেখাটি যখন সিরিয়ালাইজড হয় তৎকালের প্রভাবশালী সাহিত্যপত্রিকা দেশ এ, আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ। উপন্যাসের নামটা নিয়ে কোনো প্রশ্ন জাগেনি মনে। পরে বয়স পঞ্চাশ পেরোতেই যখন হামেশাই মনে পড়ে কথা পেছনের কথা, মনে পড়ে গ্রামের দূরন্ত শৈশব- কৈশোর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছায়াময় মায়াময় পরিবেশে তারুণ্য উচ্ছ্বল সোনালী দিন কিংবা আরো আগের আলো আঁধারির শৈশবে বাড়ির উঠোনে শীতলপাটিতে পা ছড়ানো মায়ের কোলে মাথা রেখে নক্ষত্রখচিত রাতে গল্প শোনা, তখন মনে হয়েছে কারোর পক্ষে আসলেই কি সম্ভব ফিরে না দেখা?

আমি মনে করি একজন শিল্পী- লেখক কিংবা আঁকিয়ে- যা সৃষ্টি করেন, তাতে কোনো না কোনোভাবে থাকে তার অতীতের রোমন্থন। যাপিত জীবনকে ভর করেই তিনি তার ক্যানভাস সাজান কালি ও কলমে, রঙ ও তুলিতে। শুধু নৈর্ব্যক্তিক অতীত নয়, ব্যক্তির অন্তরঙ্গ জগতের ছায়াপাতও থাকে সেই সৃজনশীল সৃষ্টিতে। তারপরও অনেকেই আবার আলাদা করে লিখেন আত্মজীবনী। মানে তো একটাই- ফিরে দেখা, ফিরে দেখা বার বার।

ইতোমধ্যে যৎকিঞ্চিত যা লিখেছি নিজের অজান্তেই তাতে দেখি ফেলে আসা 'সুদিন দুর্দিনের ছায়ারৌদ্রপাত'। নস্টালজিক মানুষ বলেই হয়তো আমার লেখায় তা থাকে আরো বেশি, আরও প্রবলভাবে।

ছোট বেলায় বেদেবহর আসতো আমাদের নদীর পাড়ে। যে ক'দিন থাকতো সাপ খেলা আর যাদু দেখিয়ে, চুড়ি, ধনন্তরি অষুদ, মাদুলি বিক্রি করে কিংবা গুলতি দিয়ে পাখির শিকার করে জমিয়ে রাখতো বেদেবেদেনিরা গোটা এলাকা। একই রকম সাপের খেলা কিংবা একই যাদু বার দেখেও আশ মিটতো না। তারপর এক সকালে দেখতাম 'নাই' হয়ে গেছে পুরো বহর- তারা চলে গেছে অন্য কোনো গন্তব্যে। বড়ো হয়ে যখন টাইমকে চিনেছি এক 'জিপসি ম্যান' হিসাবে তখন বেদেবহরের হঠাৎ হারিয়ে যাওয়াকে মিলিয়ে নিয়েছি। সময়-চোর সিঁদ কেটে কখন যে সব সাবাড় করে দেয়! আঙুলের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাওয়া সময়কে আর আঙুলে গোনা যায় না। আজ যখন নিজের গায়ে ষাটোর্ধ তকমা যুক্ত হচ্ছে, তখন মনে হচ্ছে বেদেনির পসরার মতো নিজের স্মৃতির পসরা সাজালে কেম৷ হয়!

আমার অফিসিয়াল জন্মতারিখের সাথে প্রকৃত জন্ম তারিখের কিছুটা হেরফের আছে। আমাদের বাবা নাকি আমার আগের সব ভাইবোনের জন্ম তারিখ লিখে রেখেছিলেন। আমি ও আমার জমজ বোনের ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রম ঘটেছে। বাবা সম্ভবত সে সময় কোনো ক্রাইসসিসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলেন। শরীর ও পেশা নিয়ে।

আমার লেখালেখির সাথে পরিচিত অনেকেই জানে আমি বাবাকে আমার স্মৃতিতে পাইনি। প্রথম শৈশবের, ৪/৫ বছর বয়সের, অনেক কথাই আমার মনে আছে। কোনো স্মৃতি তেতুল আর নারকেলের ছোবড়া দিয়ে ঘষা কাসার বাসনের মতো চকচকে, কোনোটা বা গোধূলির আবছায়ার মতো। যেমন বাবার অকাল মৃত্যুর পর উঠোন শীতলপাটিতে পা ছড়িয়ে গল্প করতে করতে মা'র বিলাপ শুনে মা'কে ' মা কান্দে না, আল্লা বল' - আমার এই বলাটা কি শোনা কথা নাকি নিজের মনেই আসে- আমি ঠিক বুঝি না। বাবার চেহারা আমার একেবারেই মনে পড়ে না। অথচ শুধু শ্রুতিতে পাওয়া এই বাবাটা আমার চেতনায় ঝকঝকে রোদের মতো স্পষ্ট।

স্তন্যপানের স্মৃতি নাকি মানুষের থাকে না। তবে আমি যে এক জমজ ভাই-বোনকে দেখি হঠাৎ করে খেলা ছেড়ে দৌড়ে এসে মায়ের বুকে ঝাপিয়ে পড়তে কিংবা বুড়ো- খোকাদের উৎপাত থেকে বাঁচতে মাকে স্তনের বোটায় আয়োডেক্স কিংবা তেতো কিছু মাখতে!

বড় আপার বিয়ে। তার বিয়ের তারিখ হিসেবে আমার বয়স কোনভাবেই পাঁচ বছরের বেশি নয়। বিয়ে উপলক্ষ্যে সবার জন্যই নতুন কাপড়চোপড় কেনা হয়েছে। আমি পেয়েছি এক জোড়া চামড়ার স্যান্ডেলও। বিয়ের দিন অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের সাথে এসেছেন বড় মামাও। সকালে আমি ফুলবাবু সেজে বের হয়েছি। পায়ে নতুন স্যান্ডেল। স্যান্ডেল পরা আমাকে দেখেই দাদা (আমাদের জ্যেষ্ঠতম ভ্রাতা) রেগে বলেন," এ কি, তুমি এই সকাল বেলায় কোথায় খালি পায়ে ঘাসের উপর হাঁটবে, তা না, স্যান্ডেল পরে ঘুরছো। যাও এক্ষুনি স্যান্ডেল রেখে এসে খালি পায়ে ঘাসে হাঁটো।" এসএসসি পরীক্ষার আগ পর্যন্ত ভাইবোনদের মধ্যে দাদা আমাকে আর লিলি আপাকে তুমি করে ডাকতেন, মূলত: আমরা অন্য ভাইবোনদের চেয়ে স্কুলের পড়ালেখায় ভালো ছিলাম বলে। দু'জনই পরে সে বিশেষ মর্যাদা হারিয়েছি। আমি হারিয়েছি এসএসসিতে প্রত্যাশিত রেজাল্টের চেয়ে অনেক খারাপ করায় আর লিলি আপা বিয়ের পর বরের ইচ্ছায় সালোয়ার কামিজ পরার কারণে। যাক, সে অন্য প্রসঙ্গ। তো, দাদার সব সময়ই ওই স্বাস্থ্যবাতিক ছিল। খাওয়া, ঘুমানো, সকালে ওঠা- এসব নিয়ে। ভাত খাওয়ার সময় তিনি আমাদের পীড়াপীড়ি করতেন কাঁচামরিচ খেতে। কারণ এতে ক্যারোটিন নামে কী একটা উপকারী উপাদান আছে। তো আমি দাদার কথা মেনে স্যান্ডেল রেখে আবার বের হয়েছি খালি পায়ে। শহরে থাকা বড় মামা তো আমাকে খালি পায়ে হাঁটতে দেখে অবাক," এই সকালে তুমি খালি পায়ে ঘুরছো? এক্ষুণি ঠান্ডা লাগবে। আর মাটিতে কত জার্ম আছে!" বড় মামা রাশভারি মানুষ। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। রেগে গিয়ে কার ওপর নাকি পিস্তল উঁচিয়ে গুলি করতে উদ্যত হয়েছিলেন! আমি বিনাবাক্য ব্যয়ে আবার বাড়ির ভেতর গিয়ে স্যান্ডেল পরে বেরোই। আবারও দাদার সামনে। এবার তার রাগ আরও বেশি, "অ্যাই, তোমাকে না বললাম খালি পায়ে হাঁটতে...।" আবারো মামার সামনে পড়েছিলাম খালি পায়ে। এরপর? বুঝতেই পারছেন।

পরিণত বয়সে এই ঘটনার কথা মনে হলে ভেবেছি পৃথিবীর পথে চলতে প্রতিদিন যে দ্বৈরথের মুখোমুখি হয়েছি, তার প্রথম পাঠ যেন ছিল সেই ঘটনা- একজনকে খুশি করছি তো অন্যজন নাখোশ হচ্ছেন!
আশৈশব আমি যে খুব ডানপিটে, দস্যি ছিলাম- এটা আমার ভালই মনে আছে। হয়তো বেশ কৌতুহলীও ছিলাম । কোনো কিছু অসাবধানে হাত থেকে ফেলে ভাঙার চেয়ে নিজের হাতে খুলে তা নষ্ট করার খ্যাতি ছিল আমার। বিভিন্ন স্কুল থেকে বাবার বিদায়ের সময় দেয়া ফ্রেমে বাঁধানো মানপত্র কিংবা বড় আপার বিয়েতে ছাপানো ফ্রেমে মানপত্রের পঞ্চত্ব প্রাপ্তি আমার হাতেই ঘটেছে! বিয়ের সেই মানপত্রে আপা- দুলাভাইকে সম্বোধন করে ছড়ায় ছড়ায় খুব সরস কিছু লেখা ছিল। একটা সময় ছিল- সত্তুর দশকের আগে- শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্তের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল এই মানপত্র। এখনো খুব সম্ভবত সিলেট অঞ্চলে মানপত্র ছাপিয়ে তা অতিথিদের মধ্যে লিফলেটের মতো বিলি করার প্রচলন আছে। তো, আপার বিয়ের মানপত্রে ছোট সব ভাইবোনের নামের সাথে আমার নামও ছিল । ছাপার অক্ষরে মুদ্রিত নিজের নামটা আরো ভাল করে দেখার জন্যই হয়তো ফ্রেমটা খুলেছিলাম। গ্লাস ভেঙে গেলে আলগোছে তা সরিয়ে রেখেছি কাউকে কিছু না বলে। কুকীর্তিটি আবিষ্কৃত হওয়ার পর ঘটনার ভিলেনকে সনাক্ত করতে শার্লক হোমসের দরকার পড়েনি। বাড়িতে এ ধরনের অঘটনঘটনপটিয়সীর সুখ্যাতি তখন এককভাবেই আমার। ধরা পড়ার পর নাকি বলেছি, "আমি না, আমি না, আমি ছাড়া কেউ না।" ডিনায়াল এবং কনফেশনের এমন মেলবন্ধন ঘটাতে আর ক'জন পারে!

আমার দুরন্তপনা, দস্যিতা সত্বেও ভাইবোনরা আমাকে যে কী স্নেহটাই না করেছেন! সবার ছোট - এটা অবশ্যই একটা কারণ। অন্য কারণটার মধ্যে কিছুটা আত্মশ্লাঘা আছে- তারপরও বলি, কেন জানি খুব ছোট বেলা থেকে শুনে আসছি আমার মাথা নাকি ভালো।

ছোটবেলায় এই প্রশংসা সত্বেও আমি যে পড়ালেখায় খুব মনোযোগী ছিলাম তা নয়। তবে কম পড়েও ক্লাসের পরীক্ষায় ফল খারাপ করিনি। অন্তত আমার অধ্যবসায়ী জমজ বোনের চেয়ে ঢের ভালো।
প্রাইমারিতে পড়েছি দু'টো স্কুলে। ক্লাস ফোর পর্যন্ত একটায়, অন্যটায় ক্লাস ফাইভ। প্রথম স্কুল, শাঁখচূড়া প্রাইমারি তখন ছিল আমাদের বাড়ির অদূরে, গলাকাটা বাজারের ভেতর ব্রহ্মপুত্রের তীরে। ক্লাস টু এ পড়ার সময় ছোট ওয়ানের বাচ্চাদের এক একে এক, দুই এ দুই নামতা শেখানোর জন্য ডাক পড়তো আমার। স্কুলের সামনের বটগাছের নিচে সারবদ্ধ ছোট ওয়ানের ছাত্ররা আমার সাথে নামতায় গলা মিলাতো। তবে নিজের পড়ার ক্ষেত্রে প্রায়ই চলতো ফাঁকিবাজি। মাহমুদের কবুতরের রিডিং পড়া শিখে আসিনি বলে পড়া ধরার সময় আমার টার্ণ আসতেই 'স্যার একটু পানি খেয়ে আসি' বলে হসপিটালের টিউবওয়েলে গিয়ে সময় কাটিয়ে আসার ব্যর্থ চেষ্টা করেছি। আর সুযোগ পেলেই বাজারের দোকানে দোকানে ঘুরে লোকজনের গপ্পো গেলার বাতিক তো ছিলই। তারপরও ফাইনাল পরীক্ষায় সেকেন্ড প্লেস পেয়ে গেছি এবং তা বজায় ছিল ক্লাস ফোর পর্যন্ত। সে স্কুলে আমাদের ক্লাসে ছাত্র ছিল ১৫/২০ জন। এতে নিয়ম করে আমি সেকেন্ড হতাম আর ফার্স্ট হতো মুর্শেদ। সে ছিল আমাটিয়ার একজন রিকসাওয়ালার ছেলে। শান্তশিষ্ট ছেলের আদর্শ ছিল মুর্শেদ। ওর সবকিছুই পরিপাটি। বই খাতাপত্র, স্লেট- সব। হাতের লেখাও সুন্দর। ও আমার সহপাঠী ছিল ক্লাস টেন পর্যন্ত। দু:খজনক হচ্ছে এই মুর্শেদ টেনেটুনে এসএসসি পাশ করলেও জীবন ওর প্রতি মোটেও সদয় হয়নি। জীবনযুদ্ধে বিপর্যস্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত ওকে রিক্সাও চালাতে হয়েছে। ক্লাসে মুর্শেদ সব সময়ই ছিল আমার প্রিয় বন্ধু। বলাবাহুল্য, ক্লাসের বাইরে, খেলার মাঠে কিংবা দস্যিপনায় ওকে সাথে পাইনি কখনো। অকালে চলে গেছে মুর্শেদ।
ক্লাসের এক সময়ের ফার্স্ট বয়ের পরিণতি পরিণত বয়সে জীবনকে চিনিয়েছে নতুনভাবে। চাওয়া ও পাওয়ার হিসেব করে কৃতজ্ঞতায় বলেছি- "ফাবি আইয়্যি আলাই রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান" ("অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করবে?")।
(ক্রমশ:)

(লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)

লেখক:  ড. মুনিরুছ সালেহীন, সাবেক সিনিয়র সচিব, কবি ও প্রাবন্ধিক))

১৬২ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন
ফেবু লিখন নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন